কেন ভাষা হারালে সংস্কৃতিও হারিয়ে যায়? আরবি, ফার্সি ও উর্দুর সঙ্গে মুসলিম সমাজের বিচ্ছেদের ইতিহাস
কোন এক রবিবারের রোদঝলমলে সকালে পুরানো দিল্লির জুম্মা মসজিদের কাছে গলির ভেতর এক বৃদ্ধ ক্যালিগ্রাফার বা খুশনবিশ খাতার পাতায় বাঁশের কলম দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করছিলেন। তার চারপাশের দেয়ালে ঝুলছে ফার্সি ও আরবি অক্ষরে লেখা পুরোনো সব কাসীদা ও কোরআন শরীফের আয়াত।
আলাপের একপর্যায়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উর্দুতে বললেন,
"বেটা, এই হরফগুলো শুধু লেখার কায়দা নয়, এগুলো
আমাদের আত্মার একেকটা জানালা। জানালাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।"
বৃদ্ধের এই কথাটি কেবল
একটি হারিয়ে যেতে বসা পেশার আক্ষেপ নয়, এটি একটি গোটা সমাজের সাংস্কৃতিক রূপান্তরের
নির্মম দলিল।
ভাষা কেবল যোগাযোগের
মাধ্যম নয়, এটি একটি সভ্যতার স্মৃতিভাণ্ডার।
একসময় যে ভাষা ছিল ঘরের
ভাষা, জ্ঞানের ভাষা, অনুভূতির ভাষা; কয়েক প্রজন্ম পরে সেটাই হয়ে যায় এক ধরনের রহস্য।
ভাষা হারানোর গল্প সাধারণত
এমনই। প্রথমে শব্দ হারায়, তারপর স্মৃতি। স্মৃতির পরে ইতিহাস। আর একসময় সংস্কৃতির একটা
বড় অংশও মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।
সংক্ষেপিত সারসংক্ষেপ (Article Summary / TL;DR )
ভাষা আসলে কী বহন করে?
অনেকেই মনে করেন ভাষা
মানে কেবল কথা বলার মাধ্যম। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞান, ইতিহাস ও নৃতত্ত্বের গবেষণা ভিন্ন
কথা বলে।
একটি ভাষার মধ্যে লুকিয়ে
থাকেঃ
- একটি সমাজের চিন্তার
ধরন
- ধর্মীয় ও দার্শনিক
ধারণা
- সাহিত্য ও লোককাহিনী
- সামাজিক মূল্যবোধ
- ঐতিহাসিক স্মৃতি
- রসবোধ ও আবেগ প্রকাশের
ধরন
যখন একটি ভাষা হারিয়ে
যায়, তখন শুধু কিছু শব্দ হারায় না; পৃথিবীকে দেখার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিও হারিয়ে
যায়।
কেন ভাষা হারালে সংস্কৃতিও হারিয়ে যায়?
একটি জনগোষ্ঠীর বিশ্ববীক্ষা
বা ওয়ার্ল্ডভিউ তৈরি হয় তার ভাষার অবয়বে। নৃবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞানের একটি বিখ্যাত তত্ত্ব
-'সাপির-হোরফ হাইপোথিসিস' (Sapir-Whorf Hypothesis) অনুযায়ী, মানুষ যেভাবে চিন্তা করে,
তা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত বা প্রভাবিত হয় তার ভাষার গঠন দ্বারা।
যখন একটি ভাষা বিলুপ্ত
হয়, তখন শুধু কিছু শব্দ বা ব্যাকরণ হারিয়ে যায় না, বরং সেই ভাষার অবয়বে গড়ে ওঠা অনন্য
কিছু ধারণাও পৃথিবী থেকে মুছে যায়।
মুসলিম সমাজে আরবি, ফার্সি ও উর্দুর ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইসলামের ইতিহাসে ভাষা সবসময়ই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজের ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিকড় এই তিনটি ভাষার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রতিটি ভাষারই নিজস্ব প্রশাসনিক, ধর্মীয় ও সাহিত্যিক ভূমিকা ছিল।
ভাষা - আরবীঃ
প্রধান ভূমিকাঃ কোরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির ও ধর্মীয় জ্ঞানের
মূল ভাষা
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক
প্রভাবঃ ইবাদত, কোরআন-হাদিস চর্চা
ও বৈশ্বিক সংযোগ
ভাষা - ফার্সিঃ
প্রধান ভূমিকাঃ উচ্চ সাহিত্য, সুফিবাদ, দর্শন, ইতিহাস ও প্রশাসনের
ভাষা
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক
প্রভাবঃ দরবারি সংস্কৃতি, কবিতা,
দর্শন ও ইতিহাস লিখন
ভাষা - উর্দুঃ
প্রধান ভূমিকাঃ গণযোগাযোগ ও নাগরিক সংস্কৃতি
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক
প্রভাবঃ গজল, কাওয়ালি, সামাজিক
সংহতি ও সাংবাদিকতা
শতাব্দীর পর শতাব্দী
ধরে মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চা এই ভাষাগুলোর মাধ্যমে গড়ে উঠেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ফার্সি ভাষার 'দিল' (হৃদয়/মন) শব্দটির যে বহুমাত্রিক মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক ব্যবহার সুফি সাহিত্যে রয়েছে, তা কেবল 'হৃদয়' বা 'হার্ট' শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা অসম্ভব। ভাষা হারিয়ে গেলে সেই গভীর অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতাও সমাজ হারিয়ে ফেলে।
আরবী: শুধু ধর্মীয় ভাষা নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি
অনেকেই আরবীকে কেবল ধর্মীয়
আচার-অনুষ্ঠানের ভাষা হিসেবে দেখেন।
বাস্তবে আরবী হলো -
কোরআন শরীফের ভাষা
হাদিসের ভাষা
ইসলামী আইনশাস্ত্রের
ভাষা
ইসলামী দর্শনের ভাষা
মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানচর্চার
অন্যতম ভাষা
ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দীতে
গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দর্শনের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আরবীতে
রচিত হয়েছিল।
আরবি ছিল মূলত জ্ঞান-বিজ্ঞান
ও ধর্মীয় তত্ত্বের ভাষা। আজও ইসলামী জ্ঞানের সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার আরবী ভাষাতেই সংরক্ষিত।
ফার্সি: উপমহাদেশের হারানো বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং ৭৫০ বছরের রাজভাষা
সুলতানি আমল থেকে শুরু
করে ব্রিটিশদের ফার্সি হঠানোর (১৮৩৭ সাল) পূর্ব পর্যন্ত সাড়ে সাতশত বছর ফার্সি ছিল
এই অঞ্চলের সরকারি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষা। কেবল মুসলমানরাই নন, রাজা রামমোহন রায়ের মতো
হিন্দু পণ্ডিতরাও ফার্সি ভাষায় সংবাদপত্র সম্পাদনা করতেন এবং এটি ছিল আভিজাত্য ও শিক্ষার
মাপকাঠি।
অনেকেই জানেন না যে কয়েক
শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে ফার্সি ছিল প্রশাসন, সাহিত্য ও উচ্চশিক্ষার ভাষা।
বাংলা ভাষায় ফার্সির প্রভাব
বাংলার দৈনন্দিন ব্যবহারের
বহু শব্দ এসেছে ফার্সি থেকে।
যেমন—
- দরবার
- বাজার
- দুনিয়া
- খরচ
- খবর
- আদালত
- কাগজ
বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারের
একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফার্সি উৎস থেকে এসেছে।
কেন ফার্সি হারিয়ে গেল?
ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ
শাসনের সময় প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজি চালু হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে
ফার্সি শিক্ষার সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমতে থাকে।
উর্দু: একটি সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন, সমন্বিত সংস্কৃতির প্রতীক
উর্দুর ইতিহাস দক্ষিণ
এশিয়ার বহু ভাষার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফল। দিল্লির লশকর বা সেনাশিবিরে এবং পরবর্তীকালে
লক্ষ্ণৌ ও হায়দরাবাদের নাগরিক পরিমণ্ডলে হিন্দি, ফার্সি ও আরবির মেলবন্ধনে উর্দুর বিকাশ
ঘটে। এটি ছিল একটি চমৎকার সমন্বিত (Syncretic) সংস্কৃতির বাহন, যা কেবল মুসলমানদের
নয়, উত্তর ভারতের একটি বিশাল অংশের যৌথ সম্পদ ছিল।
এই ভাষায় সৃষ্টি হয়েছে
-
- বিশাল কবিতা সাহিত্য
- দর্শনচর্চা
- ইসলামী গবেষণা
- রাজনৈতিক চিন্তাধারা
- সামাজিক পর্যবেক্ষণ
উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের
বহু গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক উর্দু ভাষায় সংঘটিত হয়েছে।
এই ভাষাগুলোর চর্চা হারিয়ে যাওয়ার কারণ
ইতিহাসের কোনো পরিবর্তনই
আকস্মিক নয়। এই তিনটি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও
সামাজিক কারণ ছিল।
১. ঔপনিবেশিক ভাষানীতি ও ১৮৩৭ সালের ধাক্কা
১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক ঐতিহাসিক নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে ফার্সির বদলে ইংরেজি ও স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষাকে আদালতের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। লর্ড মেকলের শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্যই ছিল এমন একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করা, যারা রক্তে-মাংসে ভারতীয় হলেও চিন্তায় ও ভাষায় হবে ব্রিটিশ। এক কলমের খোঁচায় রাতারাতি একটি বিশাল ঐতিহ্যবাহী শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কর্মহীন ও নিরক্ষর হয়ে পড়ে। ফার্সি জানা বুদ্ধিজীবী শ্রেণি অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যান, যা এই অঞ্চলের নিজস্ব শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেরুদণ্ডে প্রথম বড় আঘাত হানে।
চাকরি, প্রশাসন ও আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ইংরেজির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে আরবি, ফার্সি ও উর্দু ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
২. অর্থনৈতিক বাস্তবতা
মানুষ সাধারণত সেই ভাষা
শেখে যা তাকে জীবিকা অর্জনে সাহায্য করে। যখন কোনো ভাষার অর্থনৈতিক মূল্য কমে যায়,
তখন নতুন প্রজন্মের আগ্রহও কমে যায়।
অর্থনৈতিক উপযোগিতা আধুনিক যুগে ভাষার টিকে থাকার সবচেয়ে বড় শর্ত। আরবি, ফার্সি বা উর্দু জানলে বর্তমান কর্পোরেট বিশ্বে বা চাকুরির বাজারে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায় না। ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবারগুলো ইংরেজি এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রভাষার (যেমন হিন্দি বা বাংলা) দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
৩. ধর্মীয় শিক্ষার সংকোচন
অনেক স্থানে আরবী শিক্ষা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে কেবল কোরআন শরীফ তিলাওয়াত শেখার মধ্যে। ফলে উচ্চতর ভাষা দক্ষতা গড়ে ওঠে না। অনেক মানুষ কোরআন শরীফ পড়তে পারেন, কিন্তু ভাষাটি বুঝতে পারেন না।
৪. রাষ্ট্রীয় ভাষানীতি ও জাতীয় পরিচয়
বিভিন্ন দেশে জাতীয় ভাষা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় অনেক ঐতিহ্যবাহী ভাষার গুরুত্ব কমে গেছে। এটি শুধু মুসলিম সমাজে নয়, পৃথিবীর বহু সংস্কৃতিতেই ঘটেছে।
৫. ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং ভাষার রাজনৈতিক মেরুকরণ ও আত্মপরিচয়ের সংকট
১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই
অঞ্চলের ভাষারীতিকে রাজনৈতিকভাবে মেরুকরণ করে ফেলে। পাকিস্তানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা
করার চাপ এবং তার বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক আন্দোলন উর্দুর সামাজিক
গ্রহণযোগ্যতাকে বদলে দেয়।
অন্যদিকে, ভারতে উর্দুকে
কেবল 'মুসলমানদের ভাষা' হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক প্রবণতা তৈরি হয়, যার ফলে
দেবনাগরী লিপির ব্যবহার বাড়ে এবং نستعلیق (নাস্তালিক) লিপিতে উর্দু লেখার চল কমতে থাকে।
ভাষা হারানোর বহুমুখী
প্রভাব ও সামাজিক পরিণতি
এই ভাষাগত বিচ্ছিন্নতা মুসলিম সমাজের চিন্তাকাঠামোয় এক বড় ধরনের রূপান্তর ঘটিয়েছে। এর প্রভাবগুলো বেশ গভীর:
১. মূল উৎস থেকে বিচ্ছিন্নতা, ঐতিহাসিক স্মৃতির ক্ষয় ও ইতিহাসের সরলীকরণ
ইতিহাসের মূল দলিলগুলো
ফার্সি ও আরবিতে লেখা। বর্তমান প্রজন্ম সেই ভাষাগুলো না জানায় তারা নিজস্ব ইতিহাস ও
দর্শনের জন্য অনুবাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা বা রাজনৈতিক
উদ্দেশ্যে ইতিহাসের সরলীকরণ ধরার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কমে গেছে।
ফার্সি ও উর্দু ভাষায় রচিত বিপুল পরিমাণ ইতিহাস, জীবনী ও সাহিত্য নতুন প্রজন্মের কাছে ক্রমশ অপ্রবেশযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। ফলে নিজেদের অতীত সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
২. সুফি দর্শনের অবক্ষয়
ও কট্টরপন্থার উত্থান
দক্ষিণ এশিয়ার ইসলাম মূলত ফার্সি সুফি কবিদের (যেমন জালালুদ্দিন রুমি, শেখ সাদি, হাফিজ শিরাজি) মানবিক ও আধ্যাত্মিক দর্শনে জারিত ছিল। ফার্সি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ফলে মানুষ এই নমনীয়, উদার ও আধ্যাত্মিক সাহিত্য থেকে দূরে সরে গেছে। এর শূন্যস্থানে যুক্ত হয়েছে আক্ষরিক অনুবাদভিত্তিক কিছু কট্টর ধর্মীয় ব্যাখ্যা, যা সমাজের পরমতসহিষ্ণুতা কমিয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে।
৩. সাংস্কৃতিক রুচির
পরিবর্তন
উর্দু ও ফার্সির হাত ধরে যে গজল, কাওয়ালি, দাস্তানগোই (গল্প বলা) বা ক্যালিগ্রাফির মতো সূক্ষ্ম শিল্পকলা গড়ে উঠেছিল, তা আজ সংকটের মুখে। ভাষা না বোঝার কারণে এই শিল্পগুলোর গভীরতা অনুধাবন করার মতো শ্রোতা বা দর্শক কমে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক সাংস্কৃতিক রুচিকে প্রভাবিত করছে।
৪. সাহিত্যিক ঐশ্বর্যের
ক্ষতি
একটি ভাষার সঙ্গে তার সাহিত্যও হারিয়ে যায়। যখন পাঠক কমে যায়, তখন ধীরে ধীরে সাহিত্যিক উত্তরাধিকারও দুর্বল হয়ে পড়ে।
৫. চিন্তার বৈচিত্র্যের
সংকোচন
ভাষাবিদদের মতে, বিভিন্ন ভাষা মানুষের চিন্তাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। যত বেশি ভাষা জানা যায়, তত বেশি দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা সম্ভব হয়।
সুতরাং যেটা বোঝা গেলো –
ভাষা সংস্কৃতির
স্মৃতি, জ্ঞান, মূল্যবোধ ও অভিজ্ঞতা বহন করে। তাই ভাষা হারালে সংস্কৃতির একটি অংশও
হারিয়ে যায়। ভাষা সংরক্ষণ করা জরুরি কারণ ভাষার মাধ্যমে ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন ও সাংস্কৃতিক
স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
ভাষা হারালে চিন্তার
ধারাও হারিয়ে যায়: কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের উদাহরণ
ভাষার গুরুত্ব বোঝার
সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সেই ভাষার মাধ্যমে গড়ে ওঠা চিন্তাবিদ, কবি ও সংস্কারকদের দিকে
তাকানো। একটি ভাষা কেবল শব্দের ভাণ্ডার নয়; এটি মানুষ, ধারণা ও জ্ঞান-ঐতিহ্যেরও বাহক।
ফার্সি, আরবি ও উর্দু
ভাষার সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের বহু প্রভাবশালী চিন্তাবিদের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
১। আমির খুসরো (রহমাতুল্লাহি
আলাইহি): ভাষা ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন এবং সমন্বিত ভাষার সূচনা
আমির খুসরো (রহমাতুল্লাহি
আলাইহি) ছিলেন দিল্লি সালতানাত যুগের একজন কবি, সঙ্গীতজ্ঞ ও চিন্তাবিদ। তিনি ফার্সি
ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করলেও স্থানীয় ভাষাগুলোর সঙ্গে তার গভীর সংযোগ ছিল। অনেক গবেষক
তাকে হিন্দুস্তানি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম নির্মাতা বলে মনে করেন। খুসরোর রচনায়
আমরা দেখতে পাই, ভাষা কীভাবে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।
ত্রয়োদশ শতকে দিল্লির
দরবারে আমীর খসরু যখন ফার্সি ও স্থানীয় হিন্দভি ভাষার মেলবন্ধন ঘটাচ্ছিলেন, তখন তিনি
কেবল কবিতা লিখছিলেন না; তিনি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ভাষাগত ভিত্তি
স্থাপন করছিলেন। তার ফার্সি ক্যালিগ্রাফি ও কাওয়ালির ধারাটি ভাষা না জানলে আজ কেবল
একটি যান্ত্রিক সুরে পরিণত হয়।
২। ইমাম আল-গাজ্জালী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি): যুক্তি, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয় এবং আরবীর তাত্ত্বিক গভীরতা
ইমাম আল-গাজ্জালী (রহমাতুল্লাহি
আলাইহি) ছিলেন ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তার বহু
রচনা আরবিতে লিখিত। দর্শন, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তার আলোচনা আজও মুসলিম
চিন্তাজগতে গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যযুগীয় দর্শনে ইমাম
আল-গাজ্জালী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) উনার আরবীতে লেখা আকর গ্রন্থগুলো (যেমন: এহয়াউ উলুমিদ্দীন)
না পড়লে ইসলামী আধ্যাত্মিকতা ও দর্শনের মূল ভিত্তি অনুধাবন করা অসম্ভব।
আরবি ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক
দুর্বল হলে ইমাম আল-গাজ্জালী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) উনার মতো চিন্তাবিদদের মূল রচনার
সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগও কমে যায়।
৩। শাহ ওয়ালিউল্লাহ
মুহাদ্দিস দেহলবী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি): জ্ঞানসংস্কারের একজন পথিকৃৎ
শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস
দেহলবী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী চিন্তাবিদ।
তিনি আরবি, উর্দু ও ফার্সি - তিন ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। তার রচনাগুলো ইসলামী শিক্ষা,
সমাজসংস্কার এবং ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
তার কাজ দেখায় যে ভাষাজ্ঞান
কেবল ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য নয়; সমাজ ও সভ্যতা সম্পর্কে নতুন করে চিন্তা করারও একটি
মাধ্যম।
আঠারো শতকের দিল্লির
বিখ্যাত চিন্তাবিদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) যখন প্রথমবার কোরআনের ফার্সি অনুবাদ করেন, তখন রক্ষণশীল
সমাজ তাঁর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন যে, তৎকালীন ভারতের বুদ্ধিজীবী ও
শাসন ব্যবস্থার ভাষা ফার্সি। তাই ধর্মীয় জ্ঞানকে সাধারণ শিক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছাতে
ফার্সির বিকল্প ছিল না। পরবর্তীতে তাঁর পুত্ররা যখন এর উর্দু অনুবাদ করেন, তা ছিল ভারতীয়
মুসলিমদের চিন্তা ও রাজনৈতিক জাগরণের প্রধান হাতিয়ার।
৪। আল্লামা মুহম্মদ
ইকবাল: ভাষার মাধ্যমে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান
আল্লামা মুহম্মদ ইকবাল
তার দর্শন ও কবিতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি ফার্সি ও উর্দু - দুই ভাষাতেই অসাধারণ
সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। তার বহু গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক কবিতা ফার্সিতে রচিত।
বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক-কবি
আল্লামা ইকবাল তার রাজনৈতিক ও গভীরতম দার্শনিক বার্তা (যেমন: খুদি বা আত্মপরিচয়ের দর্শন)
প্রকাশের জন্য উর্দুর চেয়ে ফার্সিকে বেশি বেছে নিয়েছিলেন। কারণ ফার্সি ভাষার যে বৈশ্বিক
ও দার্শনিক ক্যানভাস ছিল, তা তৎকালীন উর্দুতে পুরোপুরি তৈরি হয়নি। আজ উপমহাদেশে ফার্সি
শিক্ষার বিলুপ্তির কারণে ইকবালের দর্শনের একটি বিশাল অংশ (যেমন: আসরার-ই-খুদি, জাবিদ
নামা) আমাদের কাছে প্রায় অপাঠ্য হয়ে গেছে।
আজকের পাঠক যদি ফার্সি
বা উর্দু না জানেন, তাহলে ইকবালের চিন্তার অনেক সূক্ষ্মতা অনুবাদের ওপর নির্ভর করে
বুঝতে হয়।
রুমী, শেখ সাদী থেকে
ইকবাল: একটি ধারাবাহিক উত্তরাধিকার
জালালউদ্দীন রুমী, শেখ
সাদী, শিরাজী। হাফিজ, শাহ ওয়ালিউল্লাহ, আল-গাজ্জালী কিংবা ইকবাল—এরা প্রত্যেকে কেবল ব্যক্তি নন; তারা একটি দীর্ঘ
বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি।
যখন কোনো সমাজ সেই ঐতিহ্যের
ভাষাগুলো থেকে দূরে সরে যায়, তখন শুধু সাহিত্য নয়, চিন্তার বহু স্তরও তার নাগালের বাইরে
চলে যায়। ভাষা হারানোর প্রকৃত ক্ষতি এখানেই; আমরা কেবল শব্দ হারাই না, আমরা আমাদের
পূর্বসূরিদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলি।
সমসাময়িক বাস্তবতা
ও কিছু ভুল ধারণা:
একটি সাধারণ ভুল ধারণা
বা মিসকনসেপশন হলো যে "ধর্মীয় মাদরাসাগুলো তো এখনো আরবি ও উর্দুর চর্চা টিকিয়ে
রেখেছে।"
কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ
করলে দেখা যায়, মাদরাসা শিক্ষায় এই ভাষাগুলোর ব্যবহার মূলত পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করা
এবং ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
সেখানে আধুনিক সাহিত্যচর্চা, দর্শন বা সৃজনশীল বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এই ভাষাগুলোর মাধ্যমে খুব একটা হচ্ছে না। অর্থাৎ, ভাষাগুলো টিকে আছে কেবল 'পবিত্র আচার' হিসেবে, জীবন্ত সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে নয়।
যেমন - মাদরাসায় আরবির যে চর্চা হয় তা মূলত ব্যাকরণ ও প্রাচীন ধর্মতত্ত্বের টেক্সট বোঝার জন্য। একটি জীবন্ত ভাষা হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ, আধুনিক বিজ্ঞান, সাহিত্য বা দর্শনের আলোচনা যেভাবে হওয়া উচিত, তা এখানে অনুপস্থিত। ফলে এটি একটি প্রায়োগিক ভাষা হিসেবে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারছে না।
নতুন প্রজন্ম কী করতে পারে?
ব্যক্তিগত পর্যায়েঃ
- প্রাথমিক আরবি শিক্ষা
গ্রহণ
- ফার্সি ও উর্দু সাহিত্য
সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি
- ভাষা শিক্ষার ডিজিটাল
সম্পদ ব্যবহার
- মূল গ্রন্থের অনুবাদের পাশাপাশি মূল ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া
সামাজিক পর্যায়েঃ
- ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র
গড়ে তোলা
- অনুবাদ প্রকল্প বৃদ্ধি
- পুরোনো পাণ্ডুলিপি
ডিজিটাইজ করা
- গবেষণা ও প্রকাশনায়
উৎসাহ দেওয়া
উপসংহার
ভাষা কখনো কেবল শব্দের
সমষ্টি নয়। এটি মানুষের স্মৃতি, পরিচয়, অনুভূতি এবং ইতিহাসের একটি জীবন্ত ভাণ্ডার।
যে সমাজ নিজের ভাষাগত ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক হারায়, সে ধীরে ধীরে নিজের অতীতের বহু
দরজাও বন্ধ করে ফেলে।
সংস্কৃতি কোনো স্থবির
বিষয় নয়; এটি নদীর মতো গতিশীল এবং পরিবর্তনশীল। সময়ের প্রয়োজনে মানুষ নতুন ভাষা শিখবে,
নতুন সংস্কৃতিকে আপন করবে - এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তবে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় যখন
কোনো জাতি তার সমৃদ্ধ অতীত ও চিন্তার ঐতিহ্যের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে,
তখন সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা মারাত্মকভাবে মার খায়।
আরবি, ফার্সি ও উর্দুর প্রশ্নটি তাই কেবল ভাষার প্রশ্ন নয়; এটি জ্ঞান, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও। আরবি, ফার্সি ও উর্দুর চর্চা কমে যাওয়া কেবল কিছু অক্ষরের বিলুপ্তি নয়, এটি আমাদের মননশীলতার একটি বড় জানালার ওপর পর্দা পড়ে যাওয়া। আজ যখন আমরা একটি অতি-যান্ত্রিক ও মেরুকৃত সমাজে বাস করছি, তখন সেই পুরোনো ভাষার উদার সাহিত্য ও সুফি দর্শন আমাদের আবার মানবিক হতে শেখাতে পারত।
আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে যদি আমরা আমাদের ভাষাগত উত্তরাধিকারকে পুরোপুরি ভুলে যাই, তাহলে হয়তো একদিন আবিষ্কার করব যে আমাদের ইতিহাসের একটি বড় অংশ আমাদের সামনেই আছে, কিন্তু আমরা আর তা পড়তে পারি না।
প্রশ্ন হলো, আগামী প্রজন্ম
কি তাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের ভাষাগুলোর সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার আগ্রহ দেখাবে, নাকি
সেগুলো শুধু গ্রন্থাগারের ধুলোমাখা তাকেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন