কেন অনেক মুসলমান কোরআন শরীফ পড়েন, কিন্তু তাঁর ভাষা, আরবী শেখেন না?

সামাজিক মাধ্যমে বহু বছর ধরে একটি গল্প ঘুরে বেড়ায়। গল্পটি সত্য কি না তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। গল্পটি এমনঃ

আমেরিকার একটি বিমানবন্দর। অভিবাসন দপ্তরের কড়া জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এক পাকিস্তানি নাগরিককে ঘিরে। তল্লাশিতে তার ব্যাগ থেকে পাওয়া গেছে একটি পবিত্র কোরআন শরীফ।

নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা কৌতূহলী হয়ে কিংবা নিতান্তই সন্দেহের বশে জানতে চাইলেন, "এই বইয়ের অমুক পৃষ্ঠায় কী লেখা আছে, বা সামগ্রিকভাবে এই গ্রন্থের মূল বার্তাটি কী, একটু বুঝিয়ে বলবেন?"

প্রশ্ন শুনে সেই যাত্রী স্থাণু হয়ে গেলেন। তিনি কোরআন শরীফ মুখস্থ বলতে পারেন, সুর করে তিলাওয়াত করতে পারেন, কিন্তু আরবি ভাষার ব্যাকরণ বা শব্দের অর্থ তাঁর জানা নেই।

ফলে কোটি কোটি মানুষের পরম শ্রদ্ধেয় একটি গ্রন্থের বাহক হয়েও, তিনি সেটির একটি লাইনের অর্থও বুঝিয়ে বলতে পারলেন না।

 

সামাজিক মাধ্যমে বহুল চর্চিত এই ঘটনাটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে সামনে এনে দাঁড় করায়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলমান অনারব (যাঁদের মাতৃভাষা আরবি নয়)। অথচ তাঁদের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন যে ধর্মগ্রন্থটি পড়ছেন, তার ভাষা তাঁরা বোঝেন না। এই আপাত-বিরোধী আচরণের নেপথ্যে কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং জড়িয়ে আছে ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য।



নিবন্ধের সংক্ষিপ্তসার (Article Summary / TL;DR )

বিশ্বের সিংহভাগ অনারব মুসলমানের কোরআন শরীফ পড়া সত্ত্বেও আরবি ভাষা না শেখার মূল কারণ হলো; ইসলামী ঐতিহ্যে তিলাওয়াতকে (আবৃত্তি) একটি স্বতন্ত্র ইবাদত বা পুণ্যময় কাজ হিসেবে গণ্য করা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপদ্ধতি, অনূদিত সাহিত্যের সহজলভ্যতা এবং ভাষা শিক্ষার কাঠামোগত জটিলতা। ফলে অর্থ বোঝার চেয়ে ধ্বনিগত পবিত্রতা রক্ষা করা সমাজমনস্তত্ত্বে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।


একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য

পৃথিবীতে খুব কম বই আছে, যা কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন পড়েন, মুখস্থ করেন, আবৃত্তি করেন; কিন্তু সেই বইয়ের ভাষা শেখার চেষ্টা করেন না।

কোরআন শরীফ সম্ভবত সেই বিরল ব্যতিক্রমগুলোর একটি।

ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশ, পাকিস্তান থেকে নাইজেরিয়া - অসংখ্য মুসলমান প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত করেন। অনেকে সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থও করেন। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ আরবী ভাষায় স্বাভাবিকভাবে পড়তে, লিখতে বা বুঝতে পারেন না।

প্রশ্নটি তাই শুধু ধর্মীয় নয়।

এটি ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মুসলিম সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গেও জড়িত।


আরবীর ধর্মতাত্ত্বিক গুরুত্ব এবং অনুবাদের সীমাবদ্ধতা:

প্রত্যেক মুসলমানের আধ্যাত্মিক ও প্রাত্যহিক জীবনে আরবি ভাষার সংযোগ এক অবিচ্ছেদ্য সত্য। প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বা নামাজ, ইসলামে প্রবেশের প্রথম সাক্ষ্য (কালিমা) থেকে শুরু করে জীবনের শেষ মুহূর্তের দোয়া - সবকিছুরই মূল ভিত্তি এই আরবী। সর্বোপরি, মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী আল-কোরআন পাঠ করতে হয় তার মূল অবতীর্ণ ভাষাতেই।

ইসলামের মূল আকরগ্রন্থগুলো কেবল অনুবাদ কিংবা কোনো ব্যাখ্যাকারের বয়ানের ওপর নির্ভর করে পুরোপুরি অনুধাবন করা প্রায় অসম্ভব। আরবির স্বভাবধর্মই এমন যে, তার শব্দে শব্দে অর্থের বহুমাত্রিকতা, অলংকারের সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং হাকিকত (অভিধার্থ বা সরাসরি অর্থ) ও মাজাযের (লক্ষ্যার্থ বা রূপক অর্থ) বিচিত্র জগৎ লুকিয়ে থাকে।

পাঠক যখন কেবল একটি অনুবাদ পড়েন, তিনি তখন মূলের একটি একমাত্রিক প্রতিচ্ছবিই দেখতে পান; আরবির সেই সামগ্রিক ব্যঞ্জনা ও তাত্ত্বিক সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হন।

এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে যে কোরআন শরীফের যে অলৌকিকতা বা মোজেজা তার ভাষা, অলংকার আর জ্ঞানতত্ত্বের পরতে পরতে নিহিত, তা একজন অনারব মুসলমানের কাছে জীবনভর স্রেফ অগোচরেই থেকে যায়!


ওহীর ভাষা:

কোরআন শরীফে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ওহীর মাধ্যম হিসেবে আরবীর নির্বাচন কোনো আকস্মিক বা কাকতালীয় বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট ও deliberate সিদ্ধান্ত।

কোরআনের একাধিক আয়াতে এই সত্যটি বারবার ঘোষিত হয়েছে:

"আমি একে আরবী ভাষার কোরআনরূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।"

সুরা ইউসুফ, আয়াত: ২


আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: 

"নিশ্চয়ই এ কোরআন রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত আত্মা (জিবরাইল) তা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার অন্তরে অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। নাজিল হয়েছে এমন আরবী ভাষায়, যা বাণীকে সুস্পষ্ট করে দেয়।"

সুরা আশ-শুআরা, আয়াত: ১৯২ - ১৯৫ 

এছাড়াও কোরআন শরীফে এসেছে:

এটি এমন একটি কিতাব, যার আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছেএকটি আরবী কোরআন, জ্ঞানসম্পন্ন লোকদের জন্য।

সুরা ফুসসিলাত, ৪১:৩

এবং,

এভাবেই আমি এটিকে আরবী কোরআন হিসেবে নাযিল করেছি।

সুরা ত্বা-হা, ২০:১১৩

আল্লাহ তায়ালা তিনি বারংবার এই 'আরবী কোরআন'-এর কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন যাতে মানুষ জ্ঞানচর্চা ও অনুধাবন করতে পারে। 

অথচ সমকালীন বাস্তবতা হলো, যে ভাষাকে আল্লাহ 'বোঝার সুবিধার্থে' সুস্পষ্ট করে নাজিল করলেন, মুসলিম সমাজের এক বিশাল অংশ আজ তা না বুঝেই কেবল আবৃত্তি করে যাচ্ছে।


ইসলাম বিস্তারের পর কী ঘটেছিল?

মুসলমানদের অধিকাংশই আরব নন

আজ বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা আরব দেশগুলোতে নয়।

বিশ্বের বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে:

- ইন্দোনেশিয়া

- পাকিস্তান

- বাংলাদেশ

- ভারত

- নাইজেরিয়া ইত্যাদি

এই জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা আরবী নয়।

তারা বাংলা, উর্দু, তুর্কি, ফার্সি, মালয় কিংবা আরও বহু ভাষায় কথা বলে।

ফলে ইসলাম গ্রহণ করা মানেই আরবি ভাষা আয়ত্ত করা; এমনটি কখনও বাস্তবতা হয়ে ওঠেনি।


তিলাওয়াত ও বোঝার মধ্যে পার্থক্য

ধর্মীয় অনুশীলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল উচ্চারণ

ঐতিহাসিকভাবে বহু মুসলিম সমাজে শিশুদের প্রথম ধর্মীয় শিক্ষা শুরু হয়েছে কোরআন শরীফ পড়া শেখার মাধ্যমে।

কিন্তু সেই শিক্ষা প্রায়ই দুটি স্তরে বিভক্ত ছিল:

১। তিলাওয়াতঃ লক্ষ্য হল সঠিকভাবে পড়া

২। তাফসির ও অর্থঃ লক্ষ্য হল বুঝে পড়া


বাস্তবে অনেক মানুষ প্রথম স্তরেই থেমে গেছেন।

তারা অক্ষর চিনেছেন, তাজবিদ শিখেছেন, কোরআন শরীফ খতম করেছেন; কিন্তু ভাষাটি শেখার সুযোগ বা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি।


ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনারব অঞ্চলে যখন এই ধর্মের বিস্তার ঘটে (যেমন পারস্য, মধ্য এশিয়া বা ভারতীয় উপমহাদেশ), তখন ভাষা শিক্ষার চেয়ে ধর্মগ্রন্থের সংরক্ষণ ও হুবহু আবৃত্তির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল।

ইসলামের বিস্তার ──► অনারব অঞ্চলে আগমন ──► ধ্বনিগত সংরক্ষণ ──► প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসা ব্যবস্থার জন্ম

পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া 'মাদরাসা' বা 'মক্তব' শিক্ষাব্যবস্থা এই ধারাকে আরও পাকাপোক্ত করে। উপমহাদেশের প্রথাগত মক্তবগুলোতে শিশুদের যেভাবে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া শুরু হয়, তার মূল ভিত্তিই হলো 'নাজেরা' (অর্থ না বুঝে দেখে পড়া) এবং 'হিফজ' (স্মৃতিতে ধরে রাখা)।

অনারব অঞ্চলে ঐতিহ্যগত শিক্ষাপদ্ধতিতে সাধারণ মানুষের জন্য আরবীকে একটি জীবন্ত যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে শেখানোর কোনো আধুনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি।


ঐতিহ্যগত মক্তব পদ্ধতিঃ

মূল লক্ষ্যঃ শব্দের সঠিক উচ্চারণ (তাজবিদ) ও মুখস্থকরণ।

পদ্ধতিঃ পুনরাবৃত্তি এবং স্মৃতিশক্তির ব্যবহার।

ফলাফলঃ দ্রুত ও নির্ভুল আবৃত্তি ক্ষমতা, কিন্তু অর্থ অধরা।


কেন আরবী শেখা এত সহজ হয়ে ওঠেনি?

১. ভাষা শেখা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া

কোরআন শরীফ পড়তে শেখা এবং আরবী ভাষা শেখা এক জিনিস নয়।

ভাষা শেখার জন্য দরকার:

- শব্দভাণ্ডার

- ব্যাকরণ

- বাক্যগঠন

- প্রাসঙ্গিক অর্থ

- ভাষার সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট

এটি বছরের পর বছর চর্চার বিষয়।


২. ধর্মীয় শিক্ষা ও ভাষা শিক্ষার মধ্যে ব্যবধান

দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে ধর্মীয় শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল কোরআন পাঠ।

ভাষাতাত্ত্বিক দক্ষতা অর্জন নয়।

ফলে একজন ব্যক্তি কোরআন শরীফ সুন্দরভাবে পড়তে পারেন, কিন্তু আয়াতের অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারেন না।

এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থার একটি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য।

 

৩. অনুবাদের ওপর নির্ভরতা

আজ শত শত ভাষায় কোরআনের অনুবাদ রয়েছে।

বাংলা, উর্দু, ইংরেজি, তুর্কি, ফরাসি - প্রায় সব বড় ভাষায় কোরআনের অর্থ পাওয়া যায়।

ফলে অনেক মুসলমান মনে করেন: “অর্থ জানতে চাইলে অনুবাদ পড়ব, আর তিলাওয়াতের জন্য মূল আরবি পড়ব।

এই বাস্তবতাও আরবী শেখার প্রয়োজনীয়তাকে অনেক ক্ষেত্রে কমিয়ে দিয়েছে।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ছাপাখানার বিস্তার এবং আধুনিক অনুবাদ সাহিত্যের জোয়ার এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। বাজারে এখন স্বনামধন্য পন্ডিতদের করা চমৎকার সব বাংলা, ইংরেজি বা উর্দু অনুবাদ পাওয়া যায়। এছাড়া ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন এক ক্লিকেই যেকোনো আয়াতের তাফসির (ব্যাখ্যা) দেখে নেওয়া সম্ভব।

সাধারণ মানুষ ভাবেন, "যেহেতু আমি মাতৃভাষায় সহজেই অর্থ ও ব্যাখ্যা পেয়ে যাচ্ছি, তাহলে বছরের পর বছর কষ্ট করে আরবীর মতো একটি অত্যন্ত জটিল এবং সমৃদ্ধ ভাষা শেখার পেছনে শ্রম দেওয়ার কী দরকার?"

এই 'বিকল্পের সহজলভ্যতা' মানুষকে মূল ভাষা শেখার দীর্ঘমেয়াদী অনুপ্রেরণা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।


এর ফলে কী সমস্যা তৈরি হয়?

অর্থ না বুঝে কেবল পবিত্র গ্রন্থ আবৃত্তি করার এই সংস্কৃতির সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিণতি বেশ সুদূরপ্রসারী। যখন ভাষা কেবল একটি আচার বা আচারের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার ভেতরের দর্শনটি হারিয়ে যায়, রয়ে যায় কেবল বহিরাঙ্গ।

১। অর্থের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ দুর্বল হয়

যখন কেউ কোনো পাঠের ভাষা জানেন না, তখন তাকে মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে হয়।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে সেই মধ্যস্থতাকারী হতে পারেন:

- অনুবাদক

- শিক্ষক

- আলেম

- বক্তা


অবশ্যই তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ভাষা জানা থাকলে পাঠকের নিজস্ব বোঝাপড়ার সুযোগও বৃদ্ধি পায়।

 

২। ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকি বাড়ে

ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেখা গেছে, মূল পাঠ সম্পর্কে অজ্ঞতা অনেক সময় ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে।

তবে এটাও সত্য যে শুধুমাত্র ভাষা জানা মানেই সঠিক ব্যাখ্যা জানা নয়।

কোরআন শরীফ বোঝার জন্য ভাষার পাশাপাশি প্রয়োজন:

- তাফসির

- ইতিহাস

- প্রেক্ষাপট

- ইসলামী জ্ঞানের অন্যান্য শাখা


৩. জ্ঞানের একচেটিয়াকরণ (Monopolization of Knowledge):

সাধারণ মানুষ যখন মূল ভাষা বোঝেন না, তখন ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যার জন্য তাঁরা সম্পূর্ণভাবে একটি নির্দিষ্ট আলেম শ্রেণীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এর ফলে ধর্মের অপব্যাখ্যা বা রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের ব্যবহারের সুযোগ বেড়ে যায়।

৪. যান্ত্রিক অনুকরণ:

ধর্মের মূল স্পিরিট বা দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করার চেয়ে বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান প্রধান হয়ে ওঠে।


৫. বিশ্বমঞ্চে ভুল বোঝাবুঝি:

ভূমিকাংশে উল্লেখিত পাকিস্তানি নাগরিকের মতো ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষা ও সচেতনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এটি ইসলামোফোবিয়া বা ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াতেও পরোক্ষভাবে জ্বালানি জোগায়।

 

এই ব্যবধান দূর করার উপায় কী?

কোরআন শরীফ তিলাওয়াত এবং বোঝার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। কারণ এটি শুধু ভাষার সমস্যা নয়; এটি শিক্ষা পদ্ধতি, সামাজিক অভ্যাস এবং ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও জড়িত। তবে ধীরে ধীরে কিছু বাস্তবসম্মত উদ্যোগ এই ব্যবধান কমাতে পারে।

১। মক্তব ও মাদরাসা শিক্ষায় শব্দার্থভিত্তিক পাঠ

দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ মুসলমানের ধর্মীয় শিক্ষার সূচনা হয় মক্তব বা মাদরাসায়। সেখানে সাধারণত সঠিক উচ্চারণ, তাজবিদ এবং মুখস্থ করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে যদি প্রতিটি আয়াতের মৌলিক শব্দার্থ শেখানো হয়, তাহলে শিশুরা শুরু থেকেই কোরআনের ভাষার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, "রহমত", "ইলম", "হিকমাহ", "সবর", "আদল", "হক"—এ ধরনের বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলোর অর্থ যদি শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই জানতে শুরু করে, তাহলে কোরআন তাদের কাছে ধীরে ধীরে একটি বোধগম্য গ্রন্থে পরিণত হবে; কেবল উচ্চারণের পাঠ্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

 

২। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় আরবীর সুযোগ বৃদ্ধি

বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে ইংরেজি শেখে, অনেকেই তৃতীয় ভাষা হিসেবেও অন্য ভাষা শেখে। সেখানে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে আধুনিক আরবি শেখার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।

তবে এই আরবি শিক্ষা কেবল ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নয়; ভাষা শিক্ষা হিসেবেও হওয়া উচিত।

কারণ আরবি আজ শুধু ধর্মীয় ভাষা নয়। এটি জাতিসংঘের স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ভাষাগুলোর একটি। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অনুবাদ, সাংবাদিকতা এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার রয়েছে।

ফলে আরবি শেখা ধর্মীয় ও পেশাগত - দুই দিক থেকেই উপকারী হতে পারে।

 

৩। অনুবাদনির্ভরতা থেকে ভাষাগত সক্ষমতার দিকে

অনুবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ মানুষ প্রথমে অনুবাদের মাধ্যমেই কোরআন শরীফের সঙ্গে পরিচিত হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা কেবল অনুবাদের ওপর নির্ভর করবে না; বরং মূল ভাষার সঙ্গেও কিছুটা পরিচিত হবে।

এতে মানুষ অন্যের ব্যাখ্যার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে নিজেরাও পাঠের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে।

 

৪। প্রযুক্তির ব্যবহার

আজকের দিনে আরবী শেখার জন্য আগের মতো দীর্ঘ ভৌগোলিক বা আর্থিক বাধা নেই।

মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন কোর্স, ইউটিউব লেকচার, ইন্টারঅ্যাকটিভ অভিধান এবং ডিজিটাল কোরআন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘরে বসেই ভাষা শেখা সম্ভব।

অনেক প্ল্যাটফর্ম এখন আয়াতভিত্তিক শব্দার্থ, ব্যাকরণ বিশ্লেষণ এবং প্রসঙ্গভিত্তিক অর্থ ব্যাখ্যার সুবিধাও দিচ্ছে। ফলে কোরআন শরীফের ভাষা শেখা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হয়েছে।

 

৫। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি সম্ভবত মানসিকতার।

আমাদের সমাজে অনেক সময় কোরআন সুন্দরভাবে পড়তে পারাকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়। অথচ ইসলামের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে বোঝা, চিন্তা করা এবং অনুধাবন করার ওপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিলাওয়াত ও বুঝে পড়াকে দুটি আলাদা পথ হিসেবে না দেখে, একই যাত্রার দুটি ধাপ হিসেবে দেখা দরকার।


উপসংহারঃ

কোরআন শরীফ পড়া এবং বোঝা - দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞতা।

ইতিহাস, ভূগোল, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ভাষাগত বাস্তবতা মিলিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে কোটি কোটি মুসলমান কোরআন শরীফ তিলাওয়াত করেন, কিন্তু তাঁর ভাষা শেখেন না। এতে তাদের ধর্মীয় পরিচয় কমে যায় না। তবে কোরআন শরীফের ভাষার সঙ্গে পরিচয় বাড়লে পাঠের গভীরতা নিঃসন্দেহে বাড়তে পারে।

তাই আসল প্রশ্ন আরবী শেখা না শেখার নয়।

আসল প্রশ্ন হলোঃ আমরা যে বইকে জীবনের পথনির্দেশক মনে করি, তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কতটা গভীর?

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা হলো সংস্কৃতির ধারক এবং চিন্তার চাবিকাঠি। কোরআন শরীফ নিজেই বহু জায়গায় মানুষকে 'চিন্তা করতে', 'গবেষণা করতে' এবং 'জ্ঞানার্জন করতে' আহ্বান জানিয়েছেন।

অর্থ না বুঝে কেবল নেকী লাভের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করা হয়তো হৃদয়ে সাময়িক শান্তি দেয়, কিন্তু তা প্রজ্ঞার জন্ম দেয় না। আজ যখন বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা নানাবিধ বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক সংকটের মুখোমুখি, তখন ধর্মগ্রন্থের শব্দ অতিক্রম করে তার মূল সত্যকে উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি। আর সেই সত্যের দুয়ার খুলতে পারে একমাত্র ভাষার সঠিক উপলব্ধি।

আমরা কি তবে ধর্মগ্রন্থকে কেবলই একটি পবিত্র আচারের ফ্রেমে বন্দি করে রাখব, নাকি তার ভেতরের জ্ঞানকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলব  - এই সিদ্ধান্ত আজ অনারব মুসলিম সমাজকেই নিতে হবে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পবিত্র আশুরা শরীফ: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ফযীলত, কারবালার শিক্ষা ও করণীয় আমল

কেন ভাষা হারালে সংস্কৃতিও হারিয়ে যায়? আরবি, ফার্সি ও উর্দুর সঙ্গে মুসলিম সমাজের বিচ্ছেদের ইতিহাস