পোস্টগুলি

কেন ভাষা হারালে সংস্কৃতিও হারিয়ে যায়? আরবি, ফার্সি ও উর্দুর সঙ্গে মুসলিম সমাজের বিচ্ছেদের ইতিহাস

ছবি
কোন এক রবিবারের রোদঝলমলে সকালে পুরানো দিল্লির জুম্মা মসজিদের কাছে গলির ভেতর এক বৃদ্ধ ক্যালিগ্রাফার বা খুশনবিশ খাতার পাতায় বাঁশের কলম দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করছিলেন। তার চারপাশের দেয়ালে ঝুলছে ফার্সি ও আরবি অক্ষরে লেখা পুরোনো সব কাসীদা ও কোরআন শরীফের আয়াত। আলাপের একপর্যায়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উর্দুতে বললেন,  "বেটা, এই হরফগুলো শুধু লেখার কায়দা নয়, এগুলো আমাদের আত্মার একেকটা জানালা। জানালাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।" বৃদ্ধের এই কথাটি কেবল একটি হারিয়ে যেতে বসা পেশার আক্ষেপ নয়, এটি একটি গোটা সমাজের সাংস্কৃতিক রূপান্তরের নির্মম দলিল। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি সভ্যতার স্মৃতিভাণ্ডার। একসময় যে ভাষা ছিল ঘরের ভাষা, জ্ঞানের ভাষা, অনুভূতির ভাষা; কয়েক প্রজন্ম পরে সেটাই হয়ে যায় এক ধরনের রহস্য। ভাষা হারানোর গল্প সাধারণত এমনই। প্রথমে শব্দ হারায়, তারপর স্মৃতি। স্মৃতির পরে ইতিহাস। আর একসময় সংস্কৃতির একটা বড় অংশও মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। তাই একটি ভাষা যখন সমাজ থেকে বিদায় নেয়, তখন তার সঙ্গে যুক্ত হাজার বছরের সংস্কৃতি, দর্শন ও জীবনবোধও চিরতরে হারিয়ে যায়। সংক্ষেপিত সারস...

কেন অনেক মুসলমান কোরআন শরীফ পড়েন, কিন্তু তাঁর ভাষা, আরবী শেখেন না?

ছবি
সামাজিক মাধ্যমে বহু বছর ধরে একটি গল্প ঘুরে বেড়ায়। গল্পটি সত্য কি না তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। গল্পটি এমনঃ আমেরিকার একটি বিমানবন্দর। অভিবাসন দপ্তরের কড়া জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এক পাকিস্তানি নাগরিককে ঘিরে। তল্লাশিতে তার ব্যাগ থেকে পাওয়া গেছে একটি পবিত্র কোরআন শরীফ। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা কৌতূহলী হয়ে কিংবা নিতান্তই সন্দেহের বশে জানতে চাইলেন, "এই বইয়ের অমুক পৃষ্ঠায় কী লেখা আছে, বা সামগ্রিকভাবে এই গ্রন্থের মূল বার্তাটি কী, একটু বুঝিয়ে বলবেন?" প্রশ্ন শুনে সেই যাত্রী স্থাণু হয়ে গেলেন। তিনি কোরআন শরীফ মুখস্থ বলতে পারেন, সুর করে তিলাওয়াত করতে পারেন, কিন্তু আরবি ভাষার ব্যাকরণ বা শব্দের অর্থ তাঁর জানা নেই। ফলে কোটি কোটি মানুষের পরম শ্রদ্ধেয় একটি গ্রন্থের বাহক হয়েও, তিনি সেটির একটি লাইনের অর্থও বুঝিয়ে বলতে পারলেন না।   সামাজিক মাধ্যমে বহুল চর্চিত এই ঘটনাটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে সামনে এনে দাঁড় করায়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলমান অনারব (যাঁদের মাতৃভাষা আরবি নয়)। অথচ তাঁদের একটি বিশাল অংশ প্রতিদ...

মুসলমানদের জন্য আরবী ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব: কোরআন বোঝা থেকে বৈশ্বিক সুযোগ

ছবি
বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসি ইসলামবিদ ও প্রাচ্যবিদ লুই মাসিনিয়ঁ (Louis Massignon) আরবি ভাষার চিরযৌবনা রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, "আরবি ভাষার কোনো শৈশব নেই, কোনো বার্ধক্যও নেই। এটি তার বিপুল শব্দভাণ্ডার, পরিভাষার সূক্ষ্মতা এবং সুশৃঙ্খল বাক্য কাঠামোর জাদুতে তার সমসাময়িক সব বোন-ভাষাকে ছাড়িয়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।" ঠিক একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছিল জার্মান ভাষাবিদ জোহান ফুকের (Johann Fück) কণ্ঠেও। আরবির অভ্যন্তরীণ ব্যাকরণগত নিখুঁত বিন্যাস দেখে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, "আরবি ভাষার কাঠামোটি একটি সুসংহত স্থাপত্যের মতো, যার প্রতিটি অংশ এতটাই সুনির্দিষ্ট যে সেখান থেকে একটি কণা খসানোরও উপায় নেই।" ইউরোপীয় এই দুই মনীষীর পর্যবেক্ষণ কেবল ভিনদেশী গবেষকদের মুগ্ধতা ছিল না, বরং এটি ছিল এক অকাট্য ঐতিহাসিক সত্য। একটি মরুভূমি থেকে উঠে আসা ভাষা কীভাবে দেড় হাজার বছর ধরে তার আদি রূপ ও ব্যাকরণগত বিশুদ্ধতা ধরে রেখে বিশ্বরাজনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় বিস্ময়। আজকের এই গতিশীল বিশ্বে যখন ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্...